গৃহহীন শাহিদার দুর্বিসহ জীবন; খুপড়ি ঘরে বসবাস

প্রকাশিত: ৪:৫১ অপরাহ্ণ, মে ৫, ২০২১

মো: আব্দুল হালিম:

পাখির বাসার মতো ছোট্ট ঘর। পলিথিন ও চটের বস্তায় ঘেরা। বাঁশের চাটায়ে পলিথিন আর তালপাতার ছানি। একটু বৃষ্টি হলে ঘরে পড়ে পানি। পল্লীকবি জসীমউদ্দিনের আসমানী কবিতার মতো শাহিদার বাড়ি দেখতে হলে ফুলবাড়িয়া উপজেলার কাহালগাঁও পূর্ব পাড়া গ্রামের যেতে হবে।
উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের কাহালগাঁও গ্রামের মোতালেব হোসের সাথে বিয়ে হয় শাহিদার। তাদের এক কন্যা সন্তান রয়েছে। স্বামী অসুস্থ্য। বাড়ি ভিটের চার শতাংশ জমি রয়েছে। এছাড়া কিছুই নেই। শাহিদা অন্যের বাড়ি ঝিয়ের কাজ করলে পরিবারের মুখের আহাড় জুটে। তা না হলে অনাহাড়ে থাকতে হয়। হতদিরদ্র অসহায় শাহিদা অন্যের বাড়ি কাজ করে দিন শেষে ঘরে রাতের শন্তির ঘুম ঘুমাতে পারেনা। বৃষ্টি বাতাসের অভাস দেখলেই ঘরের জিনিস পত্র নিয়ে ছুটে যায় পাশের বাড়ির কারো রান্না ঘরে, না হয় কোন ঘরের বারান্দায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখাযায়, কাহালগাঁও বাজার থেকে পূর্ব দিকে উথুরা সড়কের উত্তর পাশে বাঁশ বাগানের নিচে ছোট্ট একটি বাড়ি। বাড়িতে কেউ নেই। পলিথিন, চটের বস্তা ও তালপাতার একটি মাত্র ঘর। ঘরটির দৈর্ঘ ১২ ফুট  ও প্রস্থ হবে ৬ ফুট। দরজা জানালা নেই। মাটিতে কাঁথা বালিশ বিছিয়ে থাকেন তারা। টিউবওয়েল ও পায়খানা পর্যন্ত নেই বাড়িতে। কয়েক মিনিট পর পাশের বাড়ি থেকে ছুটে আসেন মধ্য বয়সী এক নারী। নাম তার শাহিদা। সাংবাদিক পরিচয় দিতে আশিউর্ধ্ব বৃদ্ধ শাশুড়ি ময়মন নেছা ও ছোট শিশু সন্তান আমেনাকে নিয়ে আসেন। ঘরের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে দেয় শাহিদা। কোন রকম ঘর দেয়ারও সামর্থ নেই তাদের। ঝড় বৃষ্টির দিন অসুস্থ্য স্বামী ও  শিশু সন্তান নিয়ে কোথায় থাকবে সে দুশ্চিন্তায় এখনি তার কপালে ভাঁজ পরেছে। প্রায় দুই বছর ধরে পলিথিনের এমন খুপড়ি ঘরে বসবাস করছেন। এর আগে তালপাতার ছানি ছিল ঘরে।
আশপাশের বাড়ির লোকজনের সাথে কথা বলে জানাগেছে, কাহালগাঁও গ্রামের আইয়ূব আলীর ছেলে মোতালেব হোসেন। প্রায় ২৫ বছর আগে লিচু গাছ থেকে পরে কোমড়ে ব্যাথা পায়। অনেক চিকিৎসা করেও ভালো হয়নি। ভারি কোন কাজ করতে পারেনা। প্রায় ১২ বছর পূর্বে মোতালেবের প্রথম স্ত্রী জাহানারা ছেলে সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মৃত্যু হয়। স্ত্রীর মারাগেলেও সন্তান বেঁচে যায়। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর দুই বছর পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন শাহিদাকে। শাহিদার বাড়ি গাজিপুরের চন্দরা। আগের স্ত্রী ঘরে দুই সন্তান ও শহিদার ঘরে রয়েছে এক কন্যা সন্তান। অসুস্থ্য মোতালেব চিকিৎসা করে সব কিছু শেষ করে ফেলেছেন। সংসারে অভাব ও ঘর না থাকায় বিয়ের উপযোক্ত মেয়েসহ দুই সন্তানকে নানার বাড়িতে দিয়ে রাখছেন।
শাহিদা খাতুন বলেন, পধানমুন্তি (প্রধানমন্ত্রী) গরীব গরে ঘর কইরা দিতাছে। আমগর কতা চেয়ারম্যান মেম্বররা কয়না, কইলে এক্কান ঘর কইরা দিত। আমনে ঘরের এক্কান ছবি উডাই নেইন,পরতিকাত (পত্রিকা) দেইন যে, পধানমুন্তি দেখলে এক্কান ঘর কইরা দিবই। ঘরডা অইলে মাইনষের বাইত কাম কইরা রাইতে ঘরে ঘুমাবার পামু।
শ্বশুড়ি ময়মন নেছা বলেন, গরীব মানুষ, কিছুই নাই, পুলাডা কিছু করার পায়না, বউডা মাইনসের বাইত (বাড়ি) কাম করে, রাইতে ঘুমবার পায় না, বৃষ্টি বাদলার দিন আইতাছে ছাওডারে (শিশু বাচ্চা) লইয়া কই থাকব, আল্লায় যানে।
স্থানীয় সাংবাদিক আ. কাদের আকন্দ জানান, শাহিদার বাড়ি আমাদের পাশের গ্রামে, তার স্বামী দীর্ঘদিন যাবৎ অসুস্থ্য। বিয়ের বয়সের একটি মেয়ে রয়েছে তাদের, ঘরের কারনে বাড়িতে রাখতে পারেনা। এমন ঘরহীন মানুষ এনায়েতপুর ইউনিয়নের মধ্যে একটি নেই।
৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. গোলাম রব্বানী তালুকদার বলেন, শাহিদাকে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সরকারি সুযোগ সুবিধা পায়, ঘরের জন্য তালিকায় নাম দিয়েছিলাম ইউএনও অফিসে,কিন্তু ঘর পায়নি। এ পরিবারটি ঘর জরুরী প্রয়োজন।
এনায়েতপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. কবির হোসেন তালুকদারকে ফোন দিলে তিনি রিসিভ করেনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল ছিদ্দিক বলেন, সরকারি ঘর এসব পরিবার পাবার যোগ্য, এমন গৃহহীন পরিবার ঘর পায়নি বিষয়টি জানা ছিল না, দেখি কি করা যায়।